স্কুল থেকে ঝরে পড়েও আজ নাসায় গবেষক ইমরান

0
2
স্কুল থেকে ঝরে পড়েও আজ নাসায় গবেষক ইমরান
স্কুল থেকে ঝরে পড়েও আজ নাসায় গবেষক ইমরান

নবম শ্রেণির পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। এরপর স্কুলও ছাড়তে হয়েছিল। উচ্চশিক্ষার পথেও একের পর এক বাধা এসেছে। বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে গিয়ে ১০ বারের বেশি ব্যর্থ হয়েছেন। আইইএলটিএস, জিআরই ও টোফেল পরীক্ষাতেও প্রথম দিকে সফলতা পাননি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন ১৫ বার।

কিন্তু এত ব্যর্থতার পরও থেমে যাননি নরসিংদীর মনোহরদীর পশ্চিম রামপুর গ্রামের আল ইমরান। সেই ইমরানই এখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে (জেপিএল) মঙ্গলগ্রহ নিয়ে গবেষণা করছেন।

ইমরানের এই পথচলা শুরু থেকেই ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু জানার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। হাতের কাছে যা পেতেন, সেটি নিয়েই নানা বিষয় খুঁজে দেখতেন। তার বাবা মো. নুরুল ইসলাম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। মা মাহমুদা খাতুন গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে ইমরান তৃতীয়।

নবম শ্রেণিতে ফেল করার পর তাকে রামনগর উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়তে হয়। পরে খিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ২০০৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৫৭ এবং ২০০৬ সালে খিদিরপুর কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.৪ পান।

স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু ফলাফল কম হওয়ায় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগই হয়নি। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও সেখানে ক্লাস করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পেলেও পছন্দের বিষয় পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।

এই বিভাগই পরে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মহাকাশ ও গ্রহবিজ্ঞান নিয়ে তার আগ্রহ তৈরি হয়। অনার্স ও মাস্টার্স—দুই পরীক্ষাতেই বিভাগে প্রথম হন তিনি। অনার্সে সিজিপিএ ছিল ৩.৬৯ এবং মাস্টার্সে ৩.৯৭। স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। কয়েকবার আবেদন করেও সেই সুযোগ পাননি। পরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক বছর শিক্ষকতা করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও সহজে সাফল্য আসেনি। আইইএলটিএস, জিআরই ও টোফেল পরীক্ষায় দুইবার করে ব্যর্থ হন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে ১৫ বার প্রত্যাখ্যাত হন।

অবশেষে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে প্ল্যানেটারি জিওসায়েন্সে মাস্টার্স করার সুযোগ পান। সেখানে তিনি পূর্ণ সিজিপিএ ৪ অর্জন করেন। এরপর ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস থেকে স্পেস অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

পিএইচডির শেষদিকে নাসার জেপিএলে পোস্টডক্টরাল ফেলো নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখতে পান ইমরান। আবেদন, যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে অবশেষে নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি নাসার জেপিএলে যোগ দেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় অবস্থিত জেপিএল নাসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র। সেখানে ইমরানের গবেষণার মূল বিষয় মঙ্গলগ্রহ। বিশেষ করে মঙ্গলগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা এবং বসবাসযোগ্য পরিবেশের অনুসন্ধান নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তার গবেষণার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন জেপিএলের গবেষণা বিজ্ঞানী ক্যাথরিন স্ট্যাক মরগান।

ইমরানের পরিবারের সদস্যরা তার এই সাফল্যে গর্বিত। তার মা মাহমুদা খাতুন বলেন, ছোটবেলা থেকেই ইমরানের নতুন কিছু জানার আগ্রহ ছিল। এখন সে নাসায় কাজ করছে—এটাই তার জন্য বড় আনন্দ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে না পারার বিষয়টি নিয়েও ইমরানের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তার ভাষায়, একটি দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হয়তো অন্য অনেক দরজা খুলে গেছে।

এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণদের মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহী করে তোলাই ইমরানের অন্যতম লক্ষ্য। তার নিজের জীবনের গল্প যেন একটি বার্তাই দেয়—একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা, একটি সুযোগ হারানো কিংবা একাধিক প্রত্যাখ্যান কোনো স্বপ্নের শেষ নয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে