সীমান্ত আলাদা করলেও ইতিহাস আলাদা করতে পারেনি

0
10
সীমান্ত আলাদা করলেও ইতিহাস আলাদা করতে পারেনি
সীমান্ত আলাদা করলেও ইতিহাস আলাদা করতে পারেনি

উৎসবের মাঠে হাজারো মানুষের ভিড়। ঘোড়সওয়ারদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, পবিত্র ঢোলের আনুষ্ঠানিকতা আর রাজাকে আনুগত্যের শপথ। তবে এটি কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক ইতিহাস, যেখানে আধুনিক রাষ্ট্রের সীমান্তের আগেও কয়েকটি জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিনের উত্তরের শহর নিক্কিতে প্রতিবছর আগস্টে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী গানি উৎসব। বাটোনু, ওয়াসাঙ্গারি ও বু জনগোষ্ঠীর যৌথ ইতিহাস ও অতীতের সংগ্রামকে স্মরণ করে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। আফ্রিকানিউজের ২৯ আগস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উৎসবটির নানা দিক।

উৎসব উপলক্ষে নিক্কির রাস্তায় নেমে আসে উৎসবের আমেজ। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন অনুষ্ঠানে। তাঁদের মধ্যে থাকেন নিক্কির রাজাও। মূল উৎসবস্থলে তাঁদের ঘিরে হাজারো মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।

গানি উৎসবের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। ষোড়শ শতকে এর সূচনা হয় বলে জানা যায়। বর্তমানে এটি শুধু বেনিনের মানুষের উৎসব নয়। টোগো, নাইজেরিয়া, নাইজারসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশ থেকেও মানুষ এতে অংশ নিতে নিক্কিতে আসেন।

উৎসবটির মূল বক্তব্য তিন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যকে সামনে আনা। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ বর্তমানে বেনিন, টোগো ও নাইজেরিয়াসহ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন।

নিক্কির রাজদরবারের সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারী প্রিন্স সিমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাটোনু ও বু জনগোষ্ঠীকে স্থানীয় বারিবা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে ওয়াসাঙ্গারি নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘যারা অন্য স্থান থেকে এসেছেন’। রাজদরবার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আলাদা ভূমিকা রয়েছে।

তবে তাদের বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থান বুঝতে হলে ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকানিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক রাষ্ট্রীয় সীমান্ত প্রতিষ্ঠার আগে এসব জনগোষ্ঠীর বসতি ও চলাচল বর্তমান বেনিন, টোগো, নাইজেরিয়া, বুরকিনা ফাসো এমনকি ঘানার কিছু অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

ঔপনিবেশিক শাসনের সময় নতুন রাজনৈতিক সীমারেখা তৈরি হলে একই জনগোষ্ঠীর মানুষ বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েন। গানি উৎসব সেই পুরোনো ঐক্য ও অভিন্ন ইতিহাসের স্মৃতিকে ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

উৎসবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আয়োজনগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘোড়সওয়ারদের শোভাযাত্রা। এর সঙ্গে রয়েছে পবিত্র ঢোলের আনুষ্ঠানিকতা এবং নিক্কির রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের রীতি। এসব আয়োজনকে স্থানীয় সংস্কৃতির জীবন্ত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গানি উৎসবের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে দর্শনার্থীরা নিক্কিতে আসায় উত্তর বেনিনের স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিনের এই আয়োজন নিক্কিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত করে তুলছে।

নিক্কির মেয়র আকিলু বায়ো মাদুগু উৎসবটিকে শহরের রাজতন্ত্র ও ঐতিহ্যের জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই আয়োজন নিক্কির রাজদরবার ও ঐতিহ্যকে আরও মর্যাদাপূর্ণভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।

সময় বদলালেও গানি উৎসব তার ঐতিহাসিক চরিত্র ধরে রেখেছে। ইসলামি, হাউসা ও স্থানীয় অ্যানিমিস্ট সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান এতে মিশে গেছে। ফলে এটি এখন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মানুষের অভিন্ন ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের এক জীবন্ত স্মারক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে