উন্নয়নের আড়ালে ক্যাম্বোডিয়ার যে সংকট

0
9
উন্নয়নের আড়ালে ক্যাম্বোডিয়ার যে সংকট
উন্নয়নের আড়ালে ক্যাম্বোডিয়ার যে সংকট

গত ২৫ বছরে দারিদ্র্য কমিয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি করেছে ক্যাম্বোডিয়া। কিন্তু দেশটির উন্নয়নের সেই মডেল এখন বড় ধরনের চাপে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবনির্ভর ব্যবসায়িক পরিবেশ দেশটির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটে ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদ মার্কুস কারবাউম এসব বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্যাম্বোডিয়ার মূল সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নীতি বা প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি নয়; বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক কাঠামোও অর্থনীতির পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে ক্যাম্বোডিয়ায় দারিদ্র্যের হার ৫০ শতাংশের বেশি থেকে কমে ২০ শতাংশের নিচে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মূল্যসংকট এবং ক্যাম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধের কারণে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় দেশটির এক মিলিয়নের বেশি মানুষ আবার চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারপরও অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এর ক্যাম্বোডিয়া ইকোনমিক আপডেট অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়তে পারে। রপ্তানি ও নতুন শিল্প খাতেও গতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে অর্থনীতির একটি বড় বৈষম্য। একদিকে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর রপ্তানি খাত, বিশেষ করে পোশাক ও জুতাশিল্প। অন্যদিকে রয়েছে দেশীয় ছোট ও মাঝারি ব্যবসা, যাদের বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে।

২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্বোডিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবসা ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের হলেও তারা মোট জিডিপির আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উৎপাদন করেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে দেশীয় ব্যবসায় প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে পোশাক কারখানা বাড়ানোর মাধ্যমে আগের মতো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ক্যাম্বোডিয়া ‘মিডল-ইনকাম ট্র্যাপ’-এ আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে আসার পর এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছানো, যেখানে মজুরি বাড়ে কিন্তু উচ্চমূল্যের শিল্প ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক তিন ধরনের সংস্কারের কথা বলেছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া, ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য ঋণ ও ডিজিটাল সুবিধা বাড়ানো এবং সক্ষম স্থানীয় ব্যবসাগুলোকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত করে বড় বিদেশি কোম্পানির সরবরাহকারী হিসেবে গড়ে তোলা।

তবে দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এসব সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়টি উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। দেশটিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে। ‘ওকনহা’ নামে পরিচিত ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণির একটি অংশ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাজারে সুবিধা, জমি ও বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ রাখে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে নতুন ও স্বাধীন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণা, প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের উৎপাদনে বড় বিনিয়োগের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত স্থানীয় বাজারে ব্যবসা করাই অনেক ক্ষেত্রে বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনাতেও ক্যাম্বোডিয়ার এই দুর্বলতা স্পষ্ট বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগকে স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে রাষ্ট্রীয় নীতি ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি এবং বড় দেশীয় কোম্পানিকে শিল্পনীতির অংশ করার ক্ষেত্রে দেশটি তুলনামূলকভাবে সক্রিয়।

ক্যাম্বোডিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন মানেট ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিক আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে থাকা রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় পরিবর্তন হয়নি—এমনটাই বিশ্লেষকের মত।

তাঁর মতে, টেকসই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য শুধু নতুন নীতি বা ডিজিটাল ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় একচেটিয়া ব্যবসায়িক ক্ষমতা কমানো, মেধাভিত্তিক প্রশাসন তৈরি, বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন শক্তিশালী করাও জরুরি।

এসব কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে ক্যাম্বোডিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে যেতে পারে এবং দেশটি দীর্ঘমেয়াদে একটি প্রতিযোগিতামূলক শিল্প অর্থনীতি হয়ে ওঠার সুযোগ হারাতে পারে বলে বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে