মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় একমত হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। মঙ্গলবার প্যারিসে দুই নেতার বৈঠকের পর বিষয়টি সামনে আসে।
এলিসি প্রাসাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়। ম্যাক্রোঁ জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য একটি বহুজাতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি এই উদ্যোগকে ‘শান্তিপূর্ণ’ মিশন হিসেবে বর্ণনা করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়ে আসে। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে কোরিয়ার জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোরিয়ার আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬১ শতাংশ এবং ন্যাফথার প্রায় ৫৪ শতাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
লি জে-মিয়ং বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করতে দক্ষিণ কোরিয়া ও ফ্রান্স ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। এর আগে এপ্রিলেও ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে হরমুজ সংকট নিয়ে আয়োজিত আলোচনায় দক্ষিণ কোরিয়া অংশ নিয়েছিল এবং প্রণালির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দক্ষিণ কোরিয়া এখনো হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। দেশটির সরকার বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে সামরিক ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। তবে প্রেসিডেন্ট লির সঙ্গে ম্যাক্রোঁর আলোচনাকে সরাসরি সেনা মোতায়েনের আলোচনা হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্টও সরাসরি কোনো দেশের সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেননি। বরং তিনি বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে একটি বহুজাতিক মিশনের কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমঝোতা ও সম্মতি তৈরি হলে এই উদ্যোগে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি কর্মকর্তাদের দল পাঠিয়েছে। হরমুজ প্রণালির আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাই তাদের উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে। তবে এই সফরকে সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি হিসেবে দেখার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো সামরিক অংশগ্রহণকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখবে এবং এর গুরুতর পরিণতি হতে পারে। ফলে সিউলের সামনে এখন একদিকে নিজেদের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি—দুই বিষয়ই বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়া শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সহযোগিতা করবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে অ-যুদ্ধমূলক সহায়তা, নজরদারি বা অন্যান্য সামুদ্রিক সহযোগিতার মতো বিকল্প সামনে থাকতে পারে। তবে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও বিবেচনা করতে হবে।
হরমুজ প্রণালির সংকট তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। লি-ম্যাক্রোঁর বৈঠকের পর এখন নজর থাকবে, এই কথিত ‘শান্তিপূর্ণ বহুজাতিক মিশনে’ দক্ষিণ কোরিয়া শেষ পর্যন্ত কী ভূমিকা নেয়।




