মাত্র এক মিনিট ৩৮ সেকেন্ড। সময়ের হিসাবে এটি খুব সামান্য। কিন্তু এই অল্প সময়ের জন্যই কেউ কেউ বছরের পর বছর পরিকল্পনা করেন, দেশ থেকে দেশে ছুটে বেড়ান এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো সাজিয়ে নেন সূর্যগ্রহণকে ঘিরে।
এমনই একদল মানুষের সঙ্গে স্পেনে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক রুডি জিগাদলো। ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সূর্যগ্রহণ অনুসরণকারী বা ‘ইক্লিপস চেজার’দের এক অদ্ভুত জগতের গল্প।
২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য স্পেনের একটি পাহাড়ি এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ১০০ মানুষ। প্রত্যেকের লক্ষ্য এক—চাঁদ যখন সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দেবে, সেই কয়েক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া।
পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট দলে অবস্থান নেন তাঁরা। কারও হাতে বিশেষায়িত দূরবীন, কারও কাছে ক্যামেরা, আবার কেউ ব্যবহার করছিলেন সূর্যগ্রহণ দেখার বিশেষ সরঞ্জাম। কয়েকশ লেন্স তখন আকাশের দিকে তাক করা।
প্রতিবেদকের বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রহণের আগে পুরো পরিবেশে ছিল এক ধরনের উৎকণ্ঠা। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করলে চারপাশের দৃশ্যও যেন অন্য রূপ নেয়। পাহাড়, ঘাস ও দূরের স্থাপনাগুলোতে আলো-ছায়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়।
এরপর চাঁদের ছায়া এগিয়ে আসতে থাকে। একসময় সূর্যের আলো পুরোপুরি ঢেকে যায়। দিনের আলো হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে আকাশে তৈরি হয় এক বিরল দৃশ্য। সেই মুহূর্তে উপস্থিত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময় ও উত্তেজনা।
তবে সূর্যগ্রহণের প্রতি এই আকর্ষণ নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন একটি বিশেষ গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য নিয়মিত ভ্রমণ করেন। তাঁদের অনেকেই নিজেদের দেখা গ্রহণের সময় পর্যন্ত হিসাব করে রাখেন।
প্রতিবেদনে ক্রিস কাটসিয়াভরিয়াদেস ও তালাত কুরেশি নামের এক ব্রিটিশ দম্পতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। দুজনই অবসরপ্রাপ্ত। ক্রিস আগে কম্পিউটার প্রোগ্রামার এবং তালাত তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। বহু বছর ধরে তাঁরা বিভিন্ন সূর্যগ্রহণ অনুসরণ করছেন।
‘ইক্লিপস-চেজার-লগ’ নামে একটি ওয়েবসাইটে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রহণ অনুসরণকারীরা তাঁদের দেখা পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় নথিভুক্ত করেন। অনেকটা প্রতিযোগিতার মতো সেখানে কে মোট কত মিনিট পূর্ণগ্রাস অবস্থার সাক্ষী হয়েছেন, তার হিসাব রাখা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রিসের নামে ২০টি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের অভিজ্ঞতা ছিল এবং সেগুলো মিলিয়ে তিনি প্রায় ৫২ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড পূর্ণগ্রাস অবস্থার সাক্ষী হয়েছেন। আংশিক ও বলয়গ্রাস গ্রহণসহ তাঁর দেখা মোট গ্রহণের সংখ্যা ছিল আরও বেশি।
কেন এত মানুষের কাছে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আংশিক গ্রহণের সঙ্গে পূর্ণগ্রাস গ্রহণের অভিজ্ঞতার পার্থক্য অনেক বেশি বলে মনে করেন তাঁরা। সূর্য পুরোপুরি ঢেকে যাওয়ার কয়েক মুহূর্তে দিনের আলো কমে আসে, প্রাণীদের আচরণেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে এবং চারপাশের পরিবেশে তৈরি হয় অস্বাভাবিক এক আবহ।
এই অভিজ্ঞতার জন্যই গ্রহণ অনুসরণকারীরা কখন কোথায় পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে, তার হিসাব বহু আগে থেকে করেন। আবহাওয়া, মেঘের সম্ভাবনা, সূর্যের অবস্থান এবং দেখার জায়গা—সবকিছু বিবেচনা করে বেছে নেন নির্দিষ্ট স্থান।
স্পেনের এবারের আয়োজনেও ছিল তেমন প্রস্তুতি। পাহাড়ের ওপর আগে থেকেই জায়গা ঠিক করে রেখেছিলেন দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ বছরের পর বছর ধরে পরিচিত হয়ে ওঠা অন্য গ্রহণ অনুসরণকারীদের সঙ্গে সেখানে হাজির হন।
সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সেই কয়েক মিনিটের অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে তাঁদের দীর্ঘ ভ্রমণের মূল স্মৃতি। আর যারা প্রথমবার এমন দৃশ্য দেখেন, তাঁদের অনেকের কাছেই এটি শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, বরং জীবনের বিরলতম অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
আকাশের এই ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তন তাই কিছু মানুষের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এর জন্য তাঁরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যান। কয়েক মিনিটের অন্ধকার তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে বছরের পর বছর অপেক্ষার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত।




