২০০ মিলিয়ন বছরের ইতিহাস লুকিয়ে যে শহরে

0
12
২০০ মিলিয়ন বছরের ইতিহাস লুকিয়ে যে শহরে
২০০ মিলিয়ন বছরের ইতিহাস লুকিয়ে যে শহরে

সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাথুরে সৈকতে। একটু মনোযোগ দিয়ে মাটিতে চোখ রাখলেই পাওয়া যেতে পারে কোটি কোটি বছর আগের কোনো প্রাণীর জীবাশ্ম। কোথাও অ্যামোনাইট, কোথাও আবার প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীর হাড়। একই সঙ্গে রয়েছে শান্ত সমুদ্রসৈকত, ঐতিহাসিক বন্দর, পাহাড়ি পথ আর উপকূলের খাবারের আয়োজন।

ইংল্যান্ডের ডরসেটের জুরাসিক উপকূলে অবস্থিত লাইম রেজিস এমনই এক শহর। জীবাশ্ম অনুসন্ধানের জন্য বিখ্যাত এই উপকূলীয় শহরটি এখন ইতিহাস ও প্রকৃতির পাশাপাশি আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও পরিচিত। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ট্রাভেলার ইউকের এক প্রতিবেদনে শহরটির নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।

লাইম রেজিসের মাটির নিচে রয়েছে ‘ব্লু লাইয়াস’ নামের চুনাপাথর ও শেলের বিশাল স্তর। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, মেসোজোয়িক যুগে প্রায় ২০ কোটি বছর আগে এসব স্তর তৈরি হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে উপকূলের পাথর ক্ষয়ে যাওয়ায় মাটির ভেতরে থাকা জীবাশ্মগুলো ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। এ কারণেই ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম অনুসন্ধান কেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে শহরটি।

এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিখ্যাত জীবাশ্ম অনুসন্ধানকারী মেরি অ্যানিংয়ের নামও। লাইম রেজিসের চার্চ ক্লিফ বিচের দিকে তাকিয়ে থাকা তাঁর একটি ভাস্কর্য রয়েছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি একটি ইকথিওসরের কঙ্কাল আবিষ্কার করেছিলেন, যা বর্তমানে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। পরে ১৮২৩ সালে তিনি লাইম রেজিসের উপকূলে বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ প্লেসিওসরাস কঙ্কাল আবিষ্কার করেন।

শহরটির সবচেয়ে পরিচিত সৈকতগুলোর একটি ফ্রন্ট বিচ। রঙিন সৈকতকুটিরে সাজানো এই অংশটি সমুদ্রের ধারে হাঁটার জন্য জনপ্রিয়। পশ্চিম দিকে রয়েছে কাঠ দিয়ে তৈরি নর্ডিক ধাঁচের সনা। আর কাছেই রয়েছে ‘দ্য কব’ নামের ঐতিহাসিক কৃত্রিম বন্দরপ্রাচীর। জেন অস্টিনের উপন্যাস Persuasion-এও এই স্থানের উল্লেখ রয়েছে।

দ্য কবের পাশেই মোনমাউথ বিচ। তুলনামূলক শান্ত এই নুড়িপাথরের সৈকত জীবাশ্ম শিকারিদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। এখানে অ্যামোনাইটের খোঁজে মানুষকে পাথর ও মাটির স্তর পরীক্ষা করতে দেখা যায়। প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের সম্পর্কে আরও জানতে পর্যটকেরা যেতে পারেন ডাইনোসরল্যান্ড ফসিল মিউজিয়ামে। সেখানে ৩০ হাজারের বেশি জীবাশ্মের সংগ্রহ রয়েছে।

শুধু জীবাশ্ম নয়, সমুদ্র থেকেও লাইম রেজিসকে দেখার সুযোগ রয়েছে। দ্য কব থেকে দ্রুতগতির নৌযাত্রার আয়োজন করে স্থানীয় অপারেটররা। ২০ মিনিটের ছোট ভ্রমণ থেকে শুরু করে প্রায় এক ঘণ্টার ক্রুজে উপকূলের উঁচু পাহাড়, গোপন ছোট উপসাগর ও সমুদ্রের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

যাঁরা হাঁটতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে দীর্ঘ উপকূলীয় পথ। মোনমাউথ বিচ থেকে সাউথ ওয়েস্ট কোস্ট পাথ ধরে পশ্চিমে হাঁটলে প্রায় এক ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় অ্যাক্সমাউথ-টু-লাইম রেজিস আন্ডারক্লিফস ন্যাশনাল নেচার রিজার্ভে। প্রায় সাত মাইল দীর্ঘ এই উপকূলীয় এলাকায় অতীতের ভূমিধসের ফলে তৈরি হয়েছে ঢেউখেলানো পাহাড়ি ভূমি ও বৈচিত্র্যময় বনাঞ্চল।

শহরে ফিরে ঘুরে দেখা যায় টাউন মিল। স্থানটির ইতিহাস ১৩৪০ সাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখানে থাকা সপ্তদশ শতকের পানিচালিত মিলটি স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এর আশপাশে শিল্পকলা স্টুডিও, পুরোনো ধাঁচের দোকান ও মৃৎশিল্পের কর্মশালা গড়ে উঠেছে।

খাবারের দিক থেকেও লাইম রেজিস পর্যটকদের হতাশ করে না। সমুদ্রসৈকতের কিয়স্কে সকালের খাবার থেকে শুরু করে স্থানীয় সামুদ্রিক খাবারের আয়োজন রয়েছে। পাহাড়ের ওপরের রকফিশ রেস্তোরাঁ থেকে লাইম বে ও শহরের ঐতিহাসিক অংশ দেখা যায়। প্রতিদিনের তাজা মাছ দিয়ে সেখানে খাবার পরিবেশন করা হয়।

লাইম রেজিসে যেতে চাইলে নিকটতম রেলস্টেশন অ্যাক্সমিনস্টার। লন্ডন ওয়াটারলু ও এক্সেটার সেন্ট ডেভিডস থেকে সেখানে সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায়। স্টেশন থেকে বাসে সহজেই শহরে পৌঁছানো যায়।

জীবাশ্মের খোঁজে যাওয়া হোক কিংবা সমুদ্রের পাশে কয়েকটি শান্ত দিন কাটানো—লাইম রেজিসে দুটিই একসঙ্গে পাওয়া যায়। কয়েকশ নয়, কয়েক কোটি বছর পুরোনো ইতিহাস আর আধুনিক সমুদ্রসৈকতের আবহ মিলিয়ে শহরটি তাই ব্রিটেনের উপকূলীয় ভ্রমণ তালিকায় আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে