একদিকে চীনের প্রাচীন রাজধানী, অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মাঝখানে মরুভূমি, পর্বত, নদী ও দুর্গম পথ। হাজার বছর আগে এসব বাধা পেরিয়েই মানুষ, পণ্য, ধর্ম, জ্ঞান ও সংস্কৃতির চলাচল গড়ে তুলেছিল এক বিশাল যোগাযোগব্যবস্থা। ইতিহাসে যা পরিচিত হয়ে ওঠে সিল্ক রোড নামে।
এই দীর্ঘ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো ‘সিল্ক রোডস: দ্য রুটস নেটওয়ার্ক অব চাংআন-তিয়ানশান করিডোর’। প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর চীনের প্রাচীন রাজধানী চাংআন ও লুওইয়াং থেকে মধ্য এশিয়ার ঝেতিসু অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে চাংআন শহরটি চীনের শিয়ান নামে পরিচিত।
ইউনেসকো ২০১৪ সালে এই করিডোরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মোট ৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থান। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন রাজধানী, রাজপ্রাসাদ, বাণিজ্যকেন্দ্র, বৌদ্ধ গুহামন্দির, দুর্গ, প্রাচীন সড়ক, ডাকব্যবস্থার স্থাপনা, পাহাড়ি গিরিপথ, প্রাচীর, সমাধি ও ধর্মীয় স্থাপনা।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই যোগাযোগপথের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের মধ্যে। এরপর প্রায় ষোড়শ শতক পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এটি এশিয়া ও ইউরোপের বিস্তৃত অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
নাম সিল্ক রোড হলেও এখানে শুধু রেশমের বাণিজ্য হতো না। দূরদূরান্তে কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, মূল্যবান সামগ্রী ও বিলাসপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি এই পথ ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল ধর্মীয় বিশ্বাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও নানা ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা।
চীনের রেশম তখন ছিল অত্যন্ত মূল্যবান পণ্য। মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেও এর চাহিদা ছিল। তবে পণ্যবিনিময়ের পাশাপাশি মানুষের চলাচল এবং জ্ঞান ও ধারণার আদান-প্রদান এই পথকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
চাংআন অঞ্চল ছিল এই করিডোরের পূর্বদিকের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। হান ও তাং রাজবংশের সময় এটি চীনের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখান থেকে পশ্চিমমুখী পথ লোস মালভূমি পেরিয়ে হেক্সি করিডোরের দিকে এগিয়ে যায়। এরপর চিন ও ছিলিয়ান পর্বতমালা অতিক্রম করে পৌঁছানো যেত দুনহুয়াংয়ের ইউমেন গিরিপথে।
অন্যদিকে তিয়ানশান করিডোর চীনের চাংআন অঞ্চল থেকে মধ্য এশিয়ার ইলি, চুই ও তালাস উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই পথের ভূপ্রকৃতি ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কোথাও তুষারঢাকা পাহাড়, কোথাও মরুভূমি, আবার কোথাও নাতিশীতোষ্ণ বন ও পাহাড়ি হ্রদ। ফলে এই অঞ্চলে যাযাবর জনগোষ্ঠী এবং কৃষি ও মরূদ্যাননির্ভর সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ তৈরি হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানও এই ইতিহাসের নানা দিক সামনে এনেছে। চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের বেইতিং, গাওচাং ও জিয়াওহে নগরের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া নিদর্শনগুলো প্রাচীন এই যোগাযোগপথের গুরুত্বের সাক্ষ্য দেয়।
এসব স্থানে বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টধর্ম ও তাওবাদের মতো বিভিন্ন ধর্মীয় প্রভাবেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও শিল্পকলায় বিভিন্ন সভ্যতার প্রভাবও স্পষ্ট।
ফলে সিল্ক রোডকে শুধু প্রাচীন বাণিজ্যপথ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের, সমাজের সঙ্গে সমাজের এবং এক সভ্যতার সঙ্গে আরেক সভ্যতার যোগাযোগের দীর্ঘ এক সেতু।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এসব প্রত্নস্থল সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজ চলছে। ডিজিটাল আর্কাইভ, গবেষণা কার্যক্রম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সিল্ক রোডের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাজার বছর আগে যে পথ ধরে ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী ও চিন্তাবিদেরা অজানা ভূখণ্ড পাড়ি দিতেন, আজ সেই পথের ধ্বংসাবশেষই গবেষকদের সামনে তুলে ধরছে এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতাগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগের এক বিস্ময়কর ইতিহাস।



