মধ্য এশিয়ার ফারগানা উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন নগর ও জনপদের ইতিহাস খুঁজতে নতুন করে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। কিরগিজস্তানের ওশ অঞ্চলের শোরোবাশাত প্রত্নস্থলে যৌথভাবে কাজ করছেন চীন ও কিরগিজস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। প্রায় সাত দশক ধরে সেখানে বড় ধরনের নিয়মিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা হয়নি।
চায়না ডেইলিতে ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ফারগানা পর্বতমালার নিচে ইয়াসি নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত শোরোবাশাতের ধ্বংসাবশেষ। বর্তমান কিরগিজস্তানের এই প্রত্নস্থলটি ঐতিহাসিক ফারগানা উপত্যকার পূর্ব অংশে পড়েছে। এই উপত্যকা বর্তমানে উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের তথ্যমতে, শোরোবাশাত এলাকায় প্রায় দেড় বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি কেন্দ্রীয় নগরের পাশাপাশি আরও দুটি মাঝারি আকারের নগর, সমাধিক্ষেত্র, উঁচু প্ল্যাটফর্ম এবং ছোট ছোট বসতির চিহ্ন রয়েছে।
এবারের অভিযানে আগের জরিপের তুলনায় আরও বিস্তারিতভাবে মাটির স্তর পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘লুওয়াং শোভেল’ নামের ঐতিহ্যবাহী একটি সরঞ্জাম। বাঁকানো এই বিশেষ কোদাল মাটির গভীরে প্রবেশ করিয়ে বের করে আনা হয়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরের মাটি পরীক্ষা করে কোন স্তর কত পুরোনো এবং সেখানে কী ধরনের মাটির গঠন রয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
চীনা দলের প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক ঝাং ওয়েইশিং জানান, এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাচীন নগরটির প্রকৃতি, বিন্যাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো কতটা সংরক্ষিত রয়েছে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
শোরোবাশাতকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গবেষণা। ২০২৩ সাল থেকে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে ফারগানা উপত্যকায় ৫০০টির বেশি প্রত্নস্থল জরিপ করা হয়। এসব স্থানের মধ্যে প্রাচীন নগর, সমাধি ও উঁচু প্ল্যাটফর্মের মতো বিভিন্ন স্থাপনা ছিল। প্রতিটি স্থান পর্যবেক্ষণ, মানচিত্র তৈরি, পরিমাপ ও ছবি তোলার মাধ্যমে নথিভুক্ত করেন গবেষকেরা।
সেই বিস্তৃত তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণের পর শোরোবাশাতকে বিস্তারিত গবেষণার জন্য নির্বাচন করা হয়। চলতি বছরের অভিযানে নগরের দেয়াল, দুর্গসদৃশ টাওয়ার, প্রবেশদ্বার ও সড়কের চিহ্ন পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোথায় খননকাজ চালানো হবে, তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোও চিহ্নিত করছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, শোরোবাশাতে কাজটি এক বছরের প্রকল্প নয়। এর জন্য পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতেও সেখানে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এই গবেষণার বড় একটি উদ্দেশ্য হলো সপ্তম শতাব্দীর আগের ফারগানা উপত্যকার ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য বের করা। সে সময় মধ্য এশিয়ার এই অঞ্চলটির সঙ্গে প্রাচীন চীনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। চীনা ঐতিহাসিক নথিতেও ফারগানা অঞ্চলের ‘দায়ুয়ান’ নামে পরিচিত একটি হেলেনীয় রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।
গবেষকদের ধারণা, প্রাচীন দায়ুয়ানের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি ইউচেং-এর সঙ্গে শোরোবাশাতের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক নথির মধ্যে মিল খুঁজছেন তাঁরা।
সিল্ক রোডের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষকদের লক্ষ্য শুধু প্রাচীন স্থাপনা শনাক্ত করা নয়, বরং সেগুলো সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা।
চীনের নর্থওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ফারগানা উপত্যকা বিষয়ক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় অংশগ্রহণ শুরু হয় ২০১৯ সালে। এরপর উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের গবেষকদের নিয়ে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেই সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় শোরোবাশাতে চলছে নতুন অনুসন্ধান।



