যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রহস্যময় প্রাগৈতিহাসিক পাথরের চক্র ‘স্টোনহেঞ্জ’ ঠিক কী উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল—এ নিয়ে কয়েক দশক ধরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতভেদ ছিল। কেউ একে সমাধিসৌধ, কেউ বলিদান দেওয়ার বেদিকি, আবার কেউ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার স্থান মনে করতেন। তবে ১৯৬৬ সালে বোস্টন ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক জেরাল্ড হকিংস বিবিসি-র এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, তিনি আইবিএম (IBM) কম্পিউটারের সাহায্যে এই রহস্য সমাধান করে ফেলেছেন। তাঁর মতে, সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্রিটেন অধিবাসীরা চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণ পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য স্টোনহেঞ্জকে একটি প্রাগৈতিহাসিক ‘কম্পিউটার’ বা গণনাযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত।
হকিংসের ১৯৬৫ সালের বিখ্যাত বই ‘স্টোনহেঞ্জ ডিকোডেড’-এ বলা হয়, স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে বাইরের পরিধিতে থাকা ৫৬টি গর্ত চন্দ্রগ্রহণের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান অবজারভেটরিতে আদি কম্পিউটার ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেন যে, এই বিশাল পাথরের খিলান ও গর্তগুলো নির্দিষ্ট সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় এবং চাঁদের চলাচলের স্থানকে নির্দেশ করে। তাঁর মতে, সেকালের পুরোহিত-শাসকেরা গ্রহণ পূর্বাভাস দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নিজেদের অলৌকিক প্রভাব বিস্তার করতেন।
তবে আধুনিক গবেষণায় হকিংসের এই ‘কম্পিউটার তত্ত্ব’ প্রায় পুরোটাই বাতিল হয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক মাইকেল পার্কার পিয়ার্সন জানান, এটি কেবল তৎকালীন সময়ের একটি ট্রেন্ডি রূপক ছিল, যা বর্তমান বিজ্ঞানে একেবারেই অনুপযোগী। আধুনিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্টোনহেঞ্জ কোনো একক সময়ে তৈরি হয়নি; বরং ১৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে এটি নির্মিত হয়েছিল। তা ছাড়া, এর পাথরগুলোর দিকনির্দেশনা গ্রহণ গণনার জন্য শতভাগ নিখুঁত ছিল না, বরং তা মূলত সূর্য ও চাঁদের বিশেষ কিছু পর্যায় উদযাপনের স্মারক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।



