জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো। কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান দ্রুত সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ বাড়াচ্ছে, পাশাপাশি ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থাতেও বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের পথে এমন একটি সংকট তৈরি হচ্ছে, যার সমাধান ছাড়া পুরো জ্বালানি রূপান্তরই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সেটি হলো পানির নিরাপত্তা।
মধ্য এশিয়ার পাঁচ দেশ কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের অর্থনীতি পানি ও জ্বালানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। অঞ্চলটির প্রধান নদীগুলোর পানি আসে তিয়েন শান ও পামির পর্বতমালা থেকে। উজানের দেশ কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান পানির উৎস এবং জলবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের বড় অংশের কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভর করে সেই পানির ওপর।
সমস্যা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পানির ভবিষ্যৎ আগের মতো নিশ্চিত নয়। তিয়েন শান ও পামির অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলছে। গত পাঁচ দশকে আমু দরিয়া ও সির দরিয়া নদীর প্রবাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে বলে OECD-এর এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে একই পানিকে ঘিরে কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবিদ্যুৎ। কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের মতো উজানের দেশগুলোতে বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা রয়েছে। পানি ধরে রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে একটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত সরাসরি অন্য দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি রূপান্তরকে শুধু সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। পানি ব্যবস্থাপনাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা। নদীর পানি ব্যবহারের তথ্য একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করা, খরা মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা তৈরি করা এবং কোন মৌসুমে কত পানি কোথায় যাবে, সে বিষয়ে আগেই সমঝোতা করা জরুরি। একই সঙ্গে সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পানির অপচয় কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অর্থের সংকটও বড় বাধা। মধ্য এশিয়ার পানি খাতে বছরে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২৬০ কোটি ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে বলে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পুরোনো সেচ ও পানি অবকাঠামো আধুনিক করতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
অন্যদিকে সহযোগিতা বাড়লে লাভও বড় হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ালে শুধু পানির নিরাপত্তাই নয়, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও বড় সুবিধা পাওয়া সম্ভব। সংস্থাটি মধ্য এশিয়ার পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাকে আলাদা না দেখে সমন্বিতভাবে পরিচালনার ওপর জোর দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় মধ্য এশিয়ার সামনে মূল প্রশ্ন শুধু কত দ্রুত তারা কয়লা ও গ্যাস থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে পারবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সীমিত পানিকে কীভাবে পাঁচ দেশের কৃষি, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির মধ্যে ন্যায্যভাবে ভাগ করা যাবে।
পানির এই সমীকরণ সমাধান করতে না পারলে সবুজ জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আর যদি দেশগুলো যৌথভাবে পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা করতে পারে, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপের মধ্যেও মধ্য এশিয়া একটি আরও স্থিতিশীল ও সমন্বিত জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।




