অর্থনীতির গতি কমে আসা, আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আটটি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে মোট ৩৬ হাজার কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঢালার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এই অর্থ সরবরাহ করা হবে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া রোববার এ তথ্য জানিয়েছে।
এই অর্থ সহায়তার আওতায় রয়েছে চীনের তিনটি বড় ব্যাংক এবং পাঁচটি বিমা প্রতিষ্ঠান। তালিকায় রয়েছে দেশটির বৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না (আইসিবিসি) এবং অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না। পাশাপাশি রয়েছে চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনসহ পাঁচটি বিমা প্রতিষ্ঠান।
চীনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এই অর্থায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়বে এবং দেশের বাস্তব অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ ও আর্থিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি দেশটির আবাসন খাত কয়েক বছর ধরে সংকটে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতা।
চীনের অর্থনীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া। দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে দেশটির জনসংখ্যা। ফলে শ্রমবাজারের আকার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও বিমা খাতে সরাসরি অর্থ ঢালার সিদ্ধান্তকে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস বলেছে, এই পদক্ষেপের ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব অর্থনীতিতে ঋণ দেওয়ার জন্য আরও বেশি অর্থ হাতে পাবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তার সময় বাইরের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও বাড়বে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা ধরে রাখা বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক নীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এই অর্থনৈতিক সহায়তার ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চীনের প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ।
দ্বিতীয় প্রান্তিকের এই প্রবৃদ্ধি চীনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেইজিং চলতি বছরের জন্য ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মার্চে ঘোষিত এই লক্ষ্য ১৯৯১ সালের পর সবচেয়ে কম বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা।
রপ্তানি খাতে চীন এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চাপ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অর্থনীতির ওপর বাড়তি প্রভাব ফেলছে।
আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি মন্দাও চীনের অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা। বাড়ির দাম ও নির্মাণ খাতে দুর্বলতা বিনিয়োগ ও ভোক্তা আস্থায় প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকোচন যুক্ত হওয়ায় অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
চীনের সর্বশেষ পদক্ষেপ তাই শুধু ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নয়; বরং ধীরগতির অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ধরে রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বেইজিংয়ের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থের প্রবাহ কতটা বাস্তব অর্থনীতিতে পৌঁছায় এবং তা ভোক্তা ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কতটা প্রভাব ফেলে। কারণ শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মূলধন জোগালেই অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে কি না, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।




