তেলের দাম কি এবার ১০০ ডলার ছাড়াবে?

0
10
তেলের দাম কি এবার ১০০ ডলার ছাড়াবে?
তেলের দাম কি এবার ১০০ ডলার ছাড়াবে?

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ছে, জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে ব্যাঘাত ঘটছে, কমে গেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি। স্বাভাবিক হিসাবে এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই সীমার নিচেই রয়েছে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম। প্রশ্ন উঠছে, সরবরাহ সংকট এতটা গভীর হওয়ার পরও তেলের বাজার কেন প্রত্যাশামতো ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে না?

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর সাত মাস আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হতো। বর্তমানে সেই পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলে। এর মধ্যেই ৩০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সংঘাত তীব্র হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তবে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। যুদ্ধ শুরুর আগের সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল প্রবাহিত হয়েছিল। পরে তা কমে ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে গেলেও কয়েক দিনের গড় হিসাবে এখনো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হলেও তা সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

আরেকটি বড় কারণ হলো বিকল্প রুট। উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে অন্য বন্দর ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করছে। সৌদি আরবের রপ্তানিতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মিসরের সিদি কেরির বন্দর দিয়ে আগস্টে তেল রপ্তানি বেড়ে ২১ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে। ইরাকও আগস্টে রপ্তানি বাড়িয়ে প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নিয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানার মতো ওপেকের বাইরের দেশগুলো চলতি বছর সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন আরও প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়াতে পারে। রাশিয়াও এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রপ্তানি করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতির একটি অংশ অন্য উৎপাদকরা সামলে দিচ্ছে।

তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে চাহিদা কমে যাওয়া। বিশেষ করে চীনে তেলের ব্যবহার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশটি জুলাই ও আগস্টে সমুদ্রপথে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে এই পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি। পরিবহন খাতে বিদ্যুতায়ন এবং কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক উৎপাদন বাড়ায় তেলের চাহিদা কমছে।

চীনের বিশাল তেল মজুতও বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। কেপলারের হিসাবে দেশটির মজুত প্রায় ১১৭ কোটি ব্যারেল।

তবে বাজারের আরেকটি চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। সরাসরি বা ফিজিক্যাল মার্কেটে তেলের দাম ইতিমধ্যে ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ওমান ফিউচারসের দাম সোমবার ব্যারেলপ্রতি ১০৪.৫৪ ডলার এবং ক্যাশ দুবাই ১০৫.১০ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ বাজারে বাস্তব তেলের সরবরাহ যথেষ্ট টানটান।

এর সঙ্গে ডিজেলের সংকটও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে আরও চাপ তৈরি হলে এবং শোধনাগারগুলো ডিজেল উৎপাদন বাড়ালে জ্বালানি বাজারে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি বড় ব্যাংকও তেলের দামের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। মরগান স্ট্যানলি চতুর্থ প্রান্তিকে ব্রেন্টের গড় দাম ১০০ ডলার হতে পারে বলে ধারণা করছে। গোল্ডম্যান স্যাকসও মধ্যপ্রাচ্যের পরিবহন সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় পূর্বাভাস সংশোধন করেছে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনো ১০০ ডলারের নিচে থাকলেও সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি চাপের। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প সরবরাহ কমে যাওয়া এবং চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাজারের দামেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে